তালাক দেওয়ার নিয়ম । রাগের মাথায় তালাক দিলে কি তালাক হয়

প্রিয় পাঠক স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোকে তালাক বলা হয় । আমাদের সকলেরই তালাক দেওয়ার নিয়ম , কোর্টের মাধ্যমে তালাক দেওয়ার নিয়ম , রাগের মাথায় তালাক দিলে কি তালাক হয় , কোর্টের মাধ্যমে তালাক দেওয়ার নিয়ম ইত্যাদি সম্পর্কে জেনে রাখা উচিত।
তালাক দেওয়ার নিয়ম । রাগের মাথায় তালাক দিলে কি তালাক হয়
আজকে আমরা আপনাদের সামনে তালাক দেওয়ার নিয়ম , কোর্টের মাধ্যমে তালাক দেওয়ার নিয়ম , রাগের মাথায় তালাক দিলে কি তালাক হয় , স্ত্রী তালাক দিলে কি তালাক হয় , divorce papers তালাক নামা ফরম ডাউনলোড , না জেনে তালাক দিলে কি হয় ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

তালাক দেওয়ার নিয়ম । রাগের মাথায় তালাক দিলে কি তালাক হয়

বিবাহের গুরুত্ব, মাহাত্ম্য এবং ফজিলতের দিকে লক্ষ্য করলে তালাক প্রথাকে একটি অত্যন্ত জঘন্য, ঘৃণিত এবং অবাঞ্ছিত কার্য বিবেচনা করতে হয়। আবূ দাউদ এবং ইবনে মাজাহ গ্রন্থে  বর্ণিত রয়েছে যে, মুবাহ অর্থাৎ জায়েজ কাজের মধ্যে তালাক অপেক্ষা অধিক ঘৃণিত কাজ আল্লাহর নিকট আর কোনোটিই নেই । অর্থাৎ বান্দাদের প্রয়োজনের জন্য আইনত তালাক জায়েজ রাখা হয়েছে বটে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে প্রয়োজন ব্যতিরেকে যদি কেউ তালাক দেয়, তবে তা আল্লাহর নিকট বড়োই ঘৃণিত ।

তালাক দেওয়ার নিয়ম

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোকে তালাক বলা হয় । শরিয়তে সাধারণভাবে তালাক বা বিচ্ছেদ ঘটানোর অধিকার কেবল স্বামীরই রয়েছে।তবে বিবাহকালীন যদি কাবীন নামায় এরূপ কোনো শর্ত করিয়ে নেওয়া হয় যে,  স্ত্রীর বিচ্ছেদ ঘটাবার অধিকার থাকবে এরূপ ক্ষেত্রে স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিতে পারবে।
তালাক দেবার সম্পূর্ণ অধিকার শুধু স্বামীর, স্ত্রীর তাতে কোনো অধিকার নেই। স্বামী তালাক দিলে স্ত্রী তালাক কবুল করুক বা না করুক, তালাক হয়ে যাবে। স্ত্রী নিজের স্বামীকে তালাক দিতে পারে না ।স্বামীকে মাত্র তিন তালাক দেবার অধিকার দেওয়া হয়েছে এর বেশি তালাক দেবার অধিকার তার নেই। যদি কেউ চার পাঁচ তালাক দেয়, তবুও তিন তালাকই পতিত হবে।

স্বামী মুখে বলল, আমি আমার স্ত্রীকে তালাক দিলাম । এতটুকু জোরে বলল যে, নিজে সে নিজের কথা শুনল । এতটুকু বলাতেই তালাক হয়ে গেল । চাই কারো সামনে বলুক বা একাই বলুক, চাই স্ত্রীকে শুনিয়ে বলুক বা না শুনিয়ে বলুক, সর্বাবস্থায়ই তালাক হয়ে যাবে।
সরীহ অর্থাৎ এক অর্থবোধক পরিষ্কার শব্দ দ্বারা তালাক দিলে তালাকের নিয়ত থাকুক বা না থাকুক এমনকি হাসি-ঠাট্টা করে তালাক দিলেও সঙ্গে সঙ্গে তালাক পতিত হবে। যদি কেউ তার স্ত্রীকে ‘হে তালাকনি' বলে ডাকে তবে তালাক হয়ে যাবে । যদিও হাসি-ঠাট্টায় এরূপ বলে ।

কেউ বলল যে, তোমাকে তালাক দেব, তবে তাতে তালাক হবে না। এভাবে যদি কেউ বলে যে, যদি তুমি অমুক কাজ করো তবে তোমাকে তালাক দেব, এতেও তালাক হবে না । চাই স্ত্রী সেই কাজ করুক বা না করুক। তবে যদি এরূপ বলে যে, যদি তুমি অমুক কাজ করো, তবে তালাক (দিলাম)। স্ত্রী সেই কাজ করা মাত্র অবশ্য তালাক হয়ে যাবে ।
যদি পরিষ্কার শব্দের দ্বারা তালাক না দেয়, বরং গোলমেলে বা পেঁচানো কথা অথবা আভাস-ইঙ্গিত বা পেঁচানো উক্তি প্রকাশ করে, তখন এ সমস্ত কথা বলার সময় যদি তার তালাক দেওয়ার নিয়ত থাকে, তবে এক তালাক বায়েন হবে। এ অবস্থায় নিকাহ পুনঃ করতে হবে। আর যদি তালাকের নিয়ত না থাকে তবে তালাক হবে না।

কেউ স্ত্রীকে তিনবার বলল, তোমাকে তালাক দিলাম, তালাক দিলাম, তালাক দিলাম। তবে তিন তালাকই পড়বে। এমনকি কেনায়া অর্থাৎ দ্ব্যর্থবোধক শব্দে তিনবার বললেও তিন তালাক পড়বে। কিন্তু যদি নিয়ত এক তালাকের হয়, শুধু কথা মজবুত করার জন্য তিনবার বলে, তবে অবশ্য এক তালাক হবে।

তালাক কত প্রকার ও কি কি ?

তালাক তিন প্রকার। যথা-
  1. তালাকে বায়েন (মুখাফ্ফাফা),
  2. তালাকে মুগাল্লাযা এবং
  3. তালাকে রেজয়ী ।

তালাকে বায়েন

বায়েন এমন তালাক, যাতে বিবাহ সম্পূর্ণ টুটে যায়। পুনরায় বিবাহ না পড়ালে ঐ স্ত্রীর স্বামীর কাছে থাকা জায়েজ নয়। সে স্বামীর কাছে থাকতে চাইলে ও স্বামীও তাকে রাখতে চাইলে আবার বিবাহের দরকার হবে। এক তালাক বা দু' তালাক পর্যন্ত বায়েন (মুখাফ্ফাফা) হতে পারে ।

তালাকে মুগাল্লাযা

তিন তালাক হলেই মুগাল্লাযা হয়ে যাবে। তালাক মুগাল্লাযা হলে বিবাহ তো সাথে সাথে টুটে যাবেই, এমনকি দ্বিতীয়বার বিবাহ করে রাখতে বা থাকতে চাইলে তাও জায়েজ হবে না। তবে যদি ঐ স্ত্রী ইদ্দতের পর অন্য কোনো জায়গায় বিবাহ বসে এবং স্বামী স্ত্রী সহবাস করার পর তালাক দেয় অথবা (দ্বিতীয়) স্বামী মরে যায় এবং তার ইদ্দত অতিক্রমের পর প্রথম স্বামী তাকে পুনরায় আনতে চায়, তবে সে রাজি হলে শরিয়তের নিয়ম অনুসারে পুনরায় বিবাহ করে তাকে আনতে পারবে।

তালাকে রেজয়ী

তালাকে রেজয়ী এমন তালাক যাতে সাথে সাথে বিবাহ টুটে যায় না। তার সুরত হলো, স্বামী পরিষ্কার শব্দে ‘এক তালাক দিলাম' বলল। এতে বিবাহ সম্পূর্ণ টুটবে না। যদি পরে অনুতপ্ত-দুঃখিত হয়ে স্বামী ঐ স্ত্রীকে রাখতে চায়, তবে পুনঃ বিবাহ করার প্রয়োজন হবে না, পুনঃ বিবাহ না করেও রাখতে পারবে। 
এমনকি মুখ দিয়ে কিছু না বলেও যদি স্বামী-স্ত্রীর মতো ব্যবহার করে, তবে তাও জায়েজ আছে। অবশ্য যদি রেজয়ী তালাক দেবার পর স্বামী তাতে স্থির থাকে এবং ঐ অবস্থায়ই ইদ্দত শেষ হয়ে যায়, তবে বিবাহ টুটে যাবে এবং স্ত্রী পৃথক হয়ে যাবে। আর ইদ্দত শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাখা বা না রাখা স্বামীর ইচ্ছাধীন। এ প্রকার তালাককে বলে রেজয়ী তালাক ।

তালাক প্রদান এর প্রকারভেদ

তালাক প্রদান দুই প্রকার : এক প্রকার হলো যে, সম্পূর্ণ পরিষ্কার শব্দে বলল যে, আমি তোমাকে তালাক দিলাম, অথবা আমি আমার স্ত্রীকে তালাক দিলাম। মোটকথা, যে বাক্যের মধ্যে একমাত্র তালাক ছাড়া অন্য কোনো অর্থ প্রকাশ পায় না, এ ধরনের তালাককে সরীহ বা প্রকাশ্য তালাক বলে। 

দ্বিতীয় প্রকার হলো, তালাকের কথা কোনো পরিষ্কার শব্দে না বলে এমন শব্দ দ্বারা বলল, যার অর্থ তালাক ব্যতীত অন্য কিছুও হতে পারে। যেমন- কেউ তার স্ত্রীকে বলল, 'আমি তোমাকে দূর করে দিলাম।' 
এ কথার অর্থ তালাকও হতে পারে এবং এ অর্থও হতে পারে যে, তালাক দেইনি বা আমি আমার স্ত্রীকে আমার কাছে আসতে নিষেধ করেছি, বা তাকে আমার নিকট হতে দূরে থাকতে বলছি। এ শ্রেণীর তালাককে কেনায়া তালাক বলে ।

কেনায়া তালাক আরো বহু প্রকার হতে পারে, যেমন- কেউ তার স্ত্রীকে বলল, 'আমি তোমার খোঁজ নিতে পারব না বা তোমার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই বা তুমি আমার নও এবং আমিও তোমার নই, বা তুমি আমার বাড়ি হতে চলে যাও।' এরূপ অন্যান্য শব্দও আছে যা দু' অর্থবোধক, আর এটাই কেনায়া তালাক ।

কোর্টের মাধ্যমে তালাক দেওয়ার নিয়ম

কোর্টের মাধ্যমে তালাক প্রদানের জন্য কোর্টের নির্ধারিত কাজির সাথে যোগাযোগ করে একজন উকিল বা এডভোকেট এর মাধ্যমে আইনগত সকল প্রক্রিয়া এবং divorce papers বা তালাক নামা ফরম পূরন করে তালাক প্রদান করতে হয়। 

রাগের মাথায় তালাক দিলে কি তালাক হয়

যে সকল বাক্য দ্বারা তালাকের ইশারা প্রকাশ পায় কিন্তু ঐ বাক্য অন্য অর্থেও ব্যবহৃত হয় এবং পরিষ্কারভাবে তালাক বুঝা যায় না, একে ‘কেনায়া তালাক' বলে। কেনায়া বাক্য দ্বারা তালাক অর্পিত হওয়ার জন্য নিয়ত করা শর্ত অর্থাৎ তালাকের নিয়ত করতে হবে অথবা কোনো ঘটনা কিংবা অবস্থা এভাবে হওয়া দরকার যা দ্বারা তালাকের উদ্দেশ্য বুঝা যায়। তালাক দিতে হলে, যে কোনো অবস্থায় নিয়ত করতে হবে। নিয়ত না করলে তালাক অর্পিত হবে না।

তালাকের আলোচনাকালে নিয়তের দরকার হয় না, কিন্তু সুস্থ কিংবা রাগের অবস্থায় নিয়ত ব্যতীত তালাক অর্পিত হবে না ।কিছু বাক্য দ্বারা শুধু শান্ত-সুস্থ অবস্থায় বললে নিয়তের দরকার হয় না, নিয়ত ছাড়াই তালাক অর্পিত হবে।
তালাকের কতিপয় বাক্য : 
  1. বের হও, 
  2. পর্দা করো, 
  3. যাত্রা করো, 
  4. স্থান ত্যাগ করো, 
  5. চাদর মোড়া দাও, 
  6. তুই জুদা, 
  7. নিজের চিন্তা করো,
  8.  ভিক্ষা করে খাও,
  9. জাহান্নামে যা, 
  10. তুই আমার নিকট মৃত বা শূকরের মতো, 
  11. তুই আমার মায়ের মতো, 
  12. আমার বোনের মতো, 
  13. তুই আমার জন্য হারাম, 
  14. তুমি ইদ্দতে বসো, 
  15. তোমাকে ভালোবাসা হতে জুদা করেছি, 
  16. তোমার ও আমার মধ্যে কোনো প্রয়োজন নেই, 
  17. তোমাকে স্বাধীন করে দিয়েছি ইত্যাদি।

স্ত্রী তালাক দিলে কি তালাক হয়

শরিয়তে সাধারণভাবে তালাক বা বিচ্ছেদ ঘটানোর অধিকার কেবল স্বামীরই রয়েছে। ন্যায়ভাবে হোক অন্যায়ভাবে হোক স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিলে বা তার সাথে বিচ্ছেদ ঘটালে তা শরিয়তে কার্যকরী হয়ে যাবে। স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ ঘটানোর বা স্বামীকে তালাক দেবার অধিকার স্ত্রীর নেই। 
হাঁ তবে বিবাহকালীন যদি কাবীন নামায় এরূপ কোনো শর্ত করিয়ে নেওয়া হয় যে, স্বামী যদি এ সমস্ত কাজ করে বা তার মধ্যে অমুক বস্তুর অভাব দেখা যায় বা এ বিষয়াবলী সে পালন না করে, তবে স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদ ঘটাবার অধিকার থাকবে এরূপ ক্ষেত্রে স্বামী কর্তৃক উল্লিখিত শর্তের খেলাফ কোনো কার্য ঘটলে স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিতে পারবে।

divorce papers তালাক নামা ফরম ডাউনলোড

নিচে divorce papers তালাক নামা ফরম ডাউনলোড  এর লিংক দেওয়া হলোঃ

না জেনে তালাক দিলে কি হয়

  • ঘুমন্ত স্বামীর মুখ দিয়ে যদি এরূপ কথা বের হয়, ‘তোমাকে তালাক বা আমার স্ত্রীকে তালাক' এরূপ বিড়বিড় করলে তালাক হবে না ।
  • কোনো অত্যাচারী কোনো স্বামীকে যথেচ্ছ অত্যাচার চালিয়ে বা প্রাণনাশ করার ভয় দেখিয়ে যদি তার নিকট হতে তার স্ত্রীর তালাক আদায় করে, অর্থাৎ উপায়হীন হয়েও তালাক দেয়, তবু তালাক হয়ে যাবে।
  • কেউ যদি শরাব, গাজা ইত্যাদি কোনো নেশার দ্রব্য পান করে মাতাল অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দেয়, হুঁশ হবার পরে আক্ষেপ করে, তবে পড়বে। তাতেও তালাক হয়ে যাবে। অনুরূপ রাগের মাথায় তালাক দিলেও তালাক

তালাক নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা

তালাক প্রথাটি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্মে প্রচলিত নেই, অথচ ইসলামে তালাক প্রথাকে ঘৃণিত ও জঘন্য কর্ম আখ্যায়িত করা সত্ত্বেও একে জায়েজ রাখা হয়েছে। এর একমাত্র কারণ হলো, ইসলাম প্রকৃতির ধর্ম এবং এর প্রতিটি বিধি-বিধান একান্ত বাস্তবধর্মী ও মানুষের জন্য পরম কল্যাণকর। আর এ কারণেই তালাক ব্যবস্থা একটা অবাঞ্ছিত কার্য সত্ত্বেও ইসলাম এটা সিদ্ধ রেখেছে। 

মানুষের পারিবারিক ও স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবনে এমন ঘটনার সৃষ্টি হতে পারে, যা দাম্পত্য ও পারিবারিক জীবনকে চরম অশান্তিময় করে তুলে, যার আর কোনো প্রতিকার নেই। যাদের মধ্যে তালাক ব্যবস্থার প্রচলন নেই, তাদের ভিতরে ঐরূপ সমস্যার সৃষ্টি হলেও শুধু অশান্তির আগুনে জ্বলে মরতে হয়।
ইসলাম তালাক প্রথা জায়েজ রাখলেও যতদূর সম্ভব, সাধ্যমতো চেষ্টার মাধ্যমেও তালাক প্রথাকে এড়িয়ে চলতে নির্দেশ দিয়েছে। একে জায়েজ রাখা হয়েছে শুধু অনন্যোপায়ের উপায় হিসেবে। শুধু তালাকের নিন্দা এবং অপবাদ করা হয়েছে নানাভাবে। মানুষকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে তালাকের পথ অবলম্বন করতে নানা প্রকারে । নিম্নে এ প্রসঙ্গে কিছু হাদীস দ্বারাই তা উপলব্ধি করা যাবে-

হুযূর (সা.) ইরশাদ করেছেন: তোমরা বিবাহ করো, কিন্তু তালাক দিও না। যে পুরুষ বা স্ত্রীলোক নানা জায়গায় স্বাদ গ্রহণ করে তাকে আল্লাহ পছন্দ করেন না।বিবাহ করো কিন্তু তালাক দিও না। তালাকে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে ।
হাদীসে আছে, স্ত্রীকে যতক্ষণ পর্যন্ত ফাহেশা অশ্লীল কাজে প্রবৃত্ত না পাও, ততক্ষণে তাকে তালাক দিও না। কেননা আল্লাহ তা'আলা বিভিন্ন স্থানের স্বাদ গ্রহণকারীকে পছন্দ করেন না । চাই সে পুরুষ-স্ত্রী যে-ই হোক ।এ হাদীসের মর্মে বুঝা যায়, যদি স্ত্রী তার সতীত্ব নষ্ট করতে উদ্যত হয় কিংবা এ ধরনের কোনো কাজ করে থাকে, তবে তাকে তালাক দেওয়া যায়।

যে স্ত্রী বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া স্বেচ্ছায় স্বামীর নিকট তালাক চাবে, তার জন্য বেহেশত হারাম হবে। অর্থাৎ এ কাজে অত্যন্ত কঠিন গুনাহ। অবশ্য ঈমানসহ মৃত্যু হলে পাপ কাজের শাস্তি ভোগ করে অবশেষে বেহেশতে যাবে।
যে সকল স্ত্রীলোক স্বামীর সাথে এমন খারাপ ব্যবহার করে, যাতে সে অবশ্য তালাক দিতে বাধ্য হয়, তারা এবং যারা একান্ত জরুরত ছাড়া স্বামীর নিকট খোলা তালাক প্রার্থনা করে, তারা মুনাফিকদের দলভুক্ত।মুনাফিকদের স্বভাব ভিতরে এক ও বাহিরে আর এক। বিবাহ চিরদিনের, অথচ সে চায় বিচ্ছিন্নতা। কাজেই কাফির না হলেও গুনাহগার হবে ।

কুরআন মাজীদে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন: ওয়া ইযা তাল্লাক্বতুমুন্ নিসা-আ ফাবালাগনা আজালাহুন্না ফাআমসিকূহুন্না বিমা‘রূফিন আও সাররিহুহূন্না বিমা'রূফিন ; ওয়ালা তুমসিকূহঁন্না দ্বিরারাল লিতা তাদূ ; ওয়া মাঁই ইয়াফ'আল যালিকা ফাকাদ যালামা নাফসাহু ; ওয়ালা তাত্তাখিযূ আয়াতিল্লাহি হুযুওয়ান ।
অর্থ : যখন তোমরা তোমাদের স্ত্রীগণকে তালাক দাও, তখন তাদের ইদ্দত পালন করতে সুযোগ দাও । এবং ঐ অবস্থায় তাদেরকে ভদ্রতার সাথে অবস্থানের ব্যবস্থা করে দাও, অন্যথা ভদ্রতা সহকারে নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিদায় করে দাও। তাদেরকে কষ্ট দেবার উদ্দেশ্যে আবদ্ধ করে রেখো না, যেন তোমরা সীমালঙ্ঘন করো। 

যে কেউ এরূপ করল সে নিজের ওপর অত্যাচার করল। তোমরা আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহকে ঠাট্টা মনে করো না। আর তোমাদের ওপর আল্লাহর যে সকল নিয়ামত রয়েছে তা তোমরা স্মরণ করো এবং তোমাদের ওপর যে কিতাব ও হিকমত নাজিল করেছেন, যা দ্বারা তোমাদেরকে উপদেশ দান করেছেন, তারও স্মরণ করো। আর আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করো। আর এও জেনে রাখো যে, আল্লাহ তা'আলা সর্ববিষয় অবগত আছেন ।

স্বামী-স্ত্রীর মিলনের পূর্বের তালাকের বর্ণনা

মিলনের পূর্বে তালাক দিলে তালাকে বায়েন হবে; তালাক সরীহ হোক বা কেনায়া হোক । এতে স্ত্রীর ইদ্দত পালন করতে হবে না। তালাক হওয়ার সাথে সাথেই সে ইচ্ছা করলে অন্যত্রও বিবাহ বসতে পারবে। আর এক তালাক দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে না। হাঁ তবে প্রথম বারেই যদি সে এক সঙ্গে দুই তালাক দেয়, তবে যা দেয় তাই পড়বে। যদি এরূপ বলে, তোমাকে তালাক, তালাক, তালাক, তবে মাত্র এক তালাক হয়ে বায়েন হয়ে যাবে ।

তিন তালাকের বর্ণনা

যদি কেউ নিজ স্ত্রীকে তিন তালাক প্রদান করে, স্পষ্ট শব্দ দ্বারা হোক বা কেনায়া শব্দ দ্বারা। মোটকথা, যে কোনো ভাবেই তিন তালাক হয়ে গেলে ঐ স্ত্রী তার স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যাবে। যদি তার সাথে বিবাহ পুনঃ করে দেওয়া হয় তবুও হারাম হবে। কেননা এ বিবাহ শুদ্ধ হবে না । উক্ত তালাক স্পষ্ট শব্দে হোক, দ্ব্যর্থবোধক শব্দে হোক, তার একই হুকুম।
একসঙ্গে তিন তালাক দিলে যেমন তোমাকে তিন তালাক দিলাম, অথবা এরূপ বলল যে, তোমাকে তালাক, তালাক, তালাক, অথবা পৃথক পৃথক তিন তালাক দিল, যেমন- আজ এক তালাক দিল, কাল এক তালাক দিল এবং পরশু এক তালাক দিল, কিংবা এ মাসে এক তালাক দিল, পরের মাসে আর এক তালাক দিল, তার পরের মাসে আর এক তালাক দিল । এসব তালাকের একই হুকুম । অর্থাৎ তিন তালাক হয়ে তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী হারাম হয়ে যাবে। 

যদি দ্বিতীয় স্বামীর সাথে প্রথম স্বামী কর্তৃক তালাকপ্রাপ্ত কোনো স্ত্রী এই শর্তে বিবাহ হয়ে থাকে যে, সহবাসের পর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেবে এরূপ চুক্তি করে নেওয়ার কোনো মূল্য নেই ; বরং কথা হলো, দ্বিতীয় স্বামীর এরূপ স্বাধীনতা থাকতে হবে যে, সে ইচ্ছা হলে ছেড়ে দিতেও পারে, না হলে নাও দিতে পারে ।
উপরোক্ত রূপ চুক্তি করে বিবাহ ঘটানো হারাম, এটা কঠিন গুনাহর কাজ। এতে আল্লাহর তরফ হতে লা'নত পতিত হয়। অবশ্য বিবাহ হয়ে যায়। তারপর দ্বিতীয় স্বামী সহবাস করে তালাক দিলে বা মারা গেলে ইদ্দতান্তে ঐ স্ত্রীকে প্রথম স্বামী পুনরায় বিবাহ করতে পারবে এবং সে বিবাহ হালাল হবে।

খোলা তালাকের বর্ণনা

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যদি কোনো ক্রমেই মিলমিশ না হয়, অথচ স্বামী তালাকও না দেয়, তবে স্ত্রীর জন্য জায়েজ আছে যে, স্বামীকে বলবে, আমার নিকট হতে কিছু টাকা নিয়ে আমাকে ছেড়ে দাও। বা এরূপও বলতে পারে যে, তোমার নিকট আমার মোহরের পাওনা টাকার আমি কোনোরূপ দাবি করি না, তুমি তার বিনিময়ে আমাকে মুক্তি দান করো। 
এরূপ বলাতে স্বামী যদি বলে, আচ্ছা আমি তোমাক ছেড়ে দিলাম । তবে এরূপ উক্তিতে স্ত্রীর ওপর এক তালাক বায়েন হবে। স্বামীর আর তাকে ফিরিয়ে রাখার ক্ষমতা থাকবে না । অবশ্য স্বামী যদি ঐ মজলিসে কিছু না বলে, অথবা স্বামী কিছু বলে চলে যায়, বা স্বামী কিছু বলার পূর্বেই যদি স্ত্রী ওঠে চলে যায়, তারপর স্বামী বলে, আচ্ছা আমি তোমাকে ছেড়ে দিলাম । তবে এতে খোলা হবে না । অর্থাৎ প্রশ্ন উত্তর একই জায়গায় হওয়া চাই । এ উপায়ে স্ত্রীর নিজেকে মুক্ত করানোকে খোলা তালাক বলে ।

স্বামী বলল, আমি তোমা হতে খোলা করলাম এবং স্ত্রী বলল যে, আমি কবুল করলাম । তখন খোলা হয়ে গেল । আর যদি স্ত্রী ঐ স্থানে জবাব না দিয়ে চলে যায় কিংবা স্ত্রী কবুলই করল না, তবে কিছুই হলো না । কিন্তু স্ত্রী যথাস্থানেই বসে রইল এবং স্বামী এটা বলে চলে গেল এবং স্ত্রী স্বামীর যাওয়ার পর কবুল করল, তবুও খোলা হয়ে গেল ।
 স্বামী শুধু বলল, আমি তোমাকে খোলা করলাম এবং স্ত্রী কবুল করল। টাকা-পয়সার কোনো কথা স্বামীও উত্থাপন করল না, স্ত্রীও করল না, তাদের স্বামী স্ত্রীর বিবাহ সম্পর্কিত সব দেনা-পাওনা মাফ হয়ে গেল । স্ত্রীর যা কিছু মোহর পাওনা ছিল তাও মাফ হয়ে গেল এবং স্বামীও যদি পূর্ণ মোহর দিয়ে থাকে তাও স্ত্রীর ফেরত দেওয়া ওয়াজিব হবে না। অবশ্য স্ত্রীর ইদ্দত খতম হওয়া পর্যন্ত তার ভরণপোষণ এবং বাসস্থান স্বামীর ব্যবস্থা করতে হবে। হাঁ তবে স্ত্রী ভরণপোষণ এবং বাসগৃহ না চাইলে তাও দিতে হবে না ।

যদি স্বামী কিছু টাকা-পয়সার উল্লেখ করে বলে যে, একশত টাকার বিনিময়ে আমি তোমাকে খোলা করলাম, আর স্ত্রী তা কবুল করে, তবে যদি স্ত্রী মোহর নিয়ে থাকে, তাহলে তার একশত টাকা দেওয়া ওয়াজিব হবে। আর মোহর না নিয়ে থাকলেও স্বামীকে তার একশত টাকা দিতে হবে, কিন্তু মোহর পাবে না। কেননা খোলার কারণে মোহর মাফ হয়ে গিয়েছে।
খোলার ব্যাপারে যদি স্বামীর অন্যায় হয়, তবে স্বামী যে টাকা পাবে তা তার জন্য হারাম হবে, আর তা নিজের কাজে ব্যবহারও করাও হারাম । আর যদি স্ত্রীর অন্যায় হয়, তবে মোহর পরিমাণের বিনিময়ে খোলা করবে। মোহর অপেক্ষা বেশি টাকা নেওয়া স্বামীর জন্য উচিত হবে না। কিন্তু যদি বেশি নেয়, তবে তা ঠিক হবে না বটে, কিন্তু গুনাহ হবে না । অবশ্য খোলা হয়ে যাবে ।

স্ত্রী খোলা করার ব্যাপারে রাজি ছিল না ; কিন্তু স্বামী অন্যায়- অত্যাচার এবং মারপিট করে তার দ্বারা খোলা করিয়েছে। তবে তালাক হয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু স্ত্রীর প্রতি টাকা-পয়সা দেওয়া ওয়াজিব হবে না। তা ছাড়া স্বামীর জিম্মায় মোহর বাকি থাকলে তাও মাফ পাবে না ।
স্বামী স্ত্রীকে বলল, আমি একশত টাকার বিনিময়ে তোমাকে তালাক দিলাম । তবে তা স্ত্রীর কবুল করার ওপর নির্ভর থাকবে। স্ত্রী কবুল না করলে তালাক পড়বে না, আর কবুল করলে এক তালাকে বায়েন পড়বে। কিন্তু স্ত্রী যদি স্থান পরিবর্তনের পর কবুল করে, তবে তালাক পড়বে না ।

 স্ত্রী বলল, আমাকে তুমি তালাক দিয়ে দাও। স্বামী বলল, তুমি তোমার মোহর ও যাবতীয় পাওনা মাফ করে দিলে আমি তোমাকে তালাক দেব। তখন স্ত্রী বলল, আচ্ছা আমি মাফ করলাম । এরপর স্বামী তাকে তালাক না দিলে কিছুই মাফ হয় না। আর ঐ বৈঠকেই তালাক দিয়ে দিলে সব কিছু মাফ হয়ে যায় ।
স্বামী নাবালেগ বা পাগল হলে খোলা করার কোনো উপায় নেই। আর স্ত্রী নাবালেগা বা পাগলিনী হলে তার পিতা নিজে টাকা দিয়ে মেয়ের পক্ষ হতে যদি খোলা করায় তবে তালাক হয়ে যাবে, কিন্তু মোহর মাফ হবে না ।

নিরুদ্দেশ স্বামীর মাসআলা

যার স্বামী একেবারে নিরুদ্দেশ বা নিখোঁজ হয়ে যায়, জীবিত আছে কি মরে গেছে তার কোনো সন্ধান নেই । এমতাবস্থায় ঐ স্ত্রী অন্যত্র বিবাহ বসতে পারবে না । হয়তো বা স্বামী (জীবিত আছে) ফিরে আসতে পারে, এ আশায় স্বামীর নব্বই বৎসর বয়স পর্যন্ত স্ত্রীকে অপেক্ষা করতে হবে। 
ঐ সময় পর্যন্ত অপেক্ষার পর হুকুম দেয়া যাবে যে, স্বামী মরে গেছে। তারপর যদি স্ত্রী ( বেঁচে থাকে) বিবাহ বসার মতো বয়স ও অবস্থা থাকে এবং তার বিবাহের ইচ্ছা থাকে, তবে স্বামীর উপরোক্ত বয়সের পর হতে চার মাস দশদিন ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পর অন্যত্র বিবাহ বসতে পারবে। তবে শর্ত এই যে, কোনো মুসলমান হাকীমের দ্বারা স্বামীর মৃত্যুর হুকুম ঘোষণা করাতে হবে।

তালাক দেওয়ার নিয়ম । রাগের মাথায় তালাক দিলে কি তালাক হয় : লেখক এর মতামত

প্রিয় পাঠক আজকে আমরা আপনাদের সামনে তালাক দেওয়ার নিয়ম , কোর্টের মাধ্যমে তালাক দেওয়ার নিয়ম , রাগের মাথায় তালাক দিলে কি তালাক হয় , স্ত্রী তালাক দিলে কি তালাক হয় , divorce papers তালাক নামা ফরম ডাউনলোড , না জেনে তালাক দিলে কি হয় , নিরুদ্দেশ স্বামীর মাসআলা , খোলা তালাকের বর্ণনা , তিন তালাকের বর্ণনা ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করলাম।

এ সংক্রান্ত আপনাদের যে কোনো মতামত বা প্রশ্ন থাকলে আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে পারেন। খুব দ্রুত আমরা আপনাদের প্রশ্ন এবং মতামতের উত্তর প্রদান করা হবে ইনশাআল্লাহ। এরকম প্রয়োজনীয় আরও তথ্য পেতে নিয়মিত আমাদের ওয়েবসাইটটি ভিজিট করুন।।ধন্যবাদ।।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url

ইসলামিক ইনফো বাংলা